মহানবী হযরত মহম্মদ (দঃ) ছিলেন একজন অভাবনীয় প্রজ্ঞাশীল ধীমান মানব, অপ্রকম্পিত চিত্ত অজেয় পৌরষ অবিচলিত মন ও অক্ষয় মনুষ্যত্ব, মানবতার নিখাদ সোনার খনি, যেখান হতে বস্তু খাসহীন স্বর্ণ-মোহর।
জ্ঞান-গরিমার পরিবেষ্টিত বাগানে। মানুষের জ্ঞান যথাসময়ে গরিমামণ্ডিত হয়ে পরিপক্কতা লাভ করলে তথায় প্রজ্ঞার ফুলটি ফুটে ওঠে। এই ফুটন্ত ফুলটির নামই মানব-সমাজে প্রজ্ঞাশীল মানর। হযরত মহম্মদ (দঃ) ছিলেন সেই প্রজ্ঞার ফুল, চির স্থিরপ্রাজ্ঞ।
বেত মনুগতিক বিদ্যাকে কেন্দ্র করে যাঁরা বুদ্ধি অর্জন করেন, তাঁরা সমাজে বুদ্ধিমান। আর যাঁরা অধীতি বিদ্যা অর্জন করে মহাবোধি লাভ করেন, তাঁরা আমাদের সমাজে ধীমান। সচরাচর মানুষের বুদ্ধি জন্ম নেয় তার বিদ্যার খোলামেলা প্রাঙ্গণে এবং মহাবোধি জন্ম নেয় বুদ্ধির সুরক্ষিত বাগিচায়। মানুষের বুদ্ধি ও বিবেকের সঠিক প্রয়োগে ও গভীর পারাবারে শুদ্ধ স্নাত হয়ে গোলাপের পাপড়ি-সদৃশ পরিচ্ছন্নতা লাভ করলে তথায় মহাবোধির ফুলটি ফুটে ওঠে। সমাজে এই বিকশিত ফুলটির নামই ধীমান মানব, ধীমান মানুষ, ধীমান পুরুষ। হযরত মহম্মদ (দঃ) সেই মহাবোধির ফুল, চির স্থিত বোধোদয়, বোধ্য ও ধীমান পুরুষ।
সাধারণত মানুষ পাঁচ সাতকে কেন্দ্র করে সত্যের দিকে ধাবমান হয়। যাদের শিখণ্ডী হয় কখনো গতানুগতিক ধর্ম, অতীতের দর্শন, কখনো বা অন্যান্য কিছু। নিঃসন্দেহে এ সমস্ত মানুষ বুদ্ধিমান। আর যাঁরা কোন শিখণ্ডীবিহীন অবস্থায় শূন্যে ভর করে মহাসত্যের দিকে ধাবমান, নির্দ্বিধায় নিঃসঙ্কোচে বলা যায়, তাঁরা জগতের ধীমান পুরুষ। যেমন হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মুসা (আঃ), হযরত 'ঈসা' (আঃ) ও হযরত মহম্মদ (দঃ) প্রমুখ ব্যক্তিগণ।
এ সংসারের ধীমান পুরুষগণ কখনো গোঁড়া, সংকীর্ণচেতা, অনুদার ও নিষ্ঠুর হন না। কোন ব্যক্তি-কামনাকে কখনো বড় করেন না। দেশের দীন হতে দরিদ্রতম মানুষগুলোই প্রথম তাঁদের চোখে পড়ে। অবহেলিত নর-নারী তাঁদের অন্তরে স্থান পায়। সমাজের অনাচার, অত্যাচার ও কুসংস্কার তাঁদের পীড়া দেয় ও অন্তর-জগৎকে ক্ষত-বিক্ষত করে। তাঁদের ক্ষমা ও দয়া দেখার মতো দৃষ্টান্তস্বরূপ। তাঁদের মায়া ও মায়ের স্নেহকেও ম্লান করে তুলে। তাঁরা সব সময় অত্যন্ত উদার প্রকৃতির ও ভীষণ হৃদয়বান হন। সবার ঊর্ধ্বে সমাজে তাঁরা বড়ই চিন্তাশীল ও গতিশীল হন। তাঁদের মধ্যে গোঁড়ামির ও নিষ্ঠুরতার লেশমাত্র থাকে না। গোঁড়া তাঁরাই, যাঁরাই কোন কিছুর গোঁড়াকে ধরে বসে থাকতে ভালবাসেন। সমুখে এক পাও ফেলতে চান না। তাই গোঁড়াগণ চিরদিনই চির স্ববির এবং নিষ্ঠুরগণ চিরদিনই ভোগকেন্দ্রীক, মিথ্যা আচারের প্রবর্তক।
প্রজাশীল ধীমান ব্যক্তিগণ এর ঠিক বিপরীতধর্মী হন। যাঁদের জীবন ভোগে নয়, ত্যাগে, আত্ম-স্বার্থে নয় আত্মত্যাগে ও পরার্থে। যাঁরা দূর অতীতের প্রাণহীন প্রথা-সর্বস্ব পচা দুর্গন্ধময় অপকারাচ্ছন্ন সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন গোঁড়ামি সহ গোঁড়াটিকে শিকড়সহ তুলে ফেলতে চান বা তুলে ফেলেও দেন। আমাদের নিকট এইটাই তাঁদের অবদান এবং আমাদের চলার পথে এইটাই তাঁদের আবেদন ও অনিবার্য এবং অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা।
মানবসমাজের জন্য হযরত মহম্মদ (দঃ) ঐরূপ একটি অভাবনীয় অধীতি বিদ্যা-বুদ্ধি ও জান-গরিমা সম্পন্ন ধীমান মানুষ। তিনি ছিলেন মানব-সমাজের চলমান জগতের আবর্তনে ও বিবর্তনে ও নব নব আধুনিক পরিকল্পনার প্রাচুর্যে ভরা গতিশীল প্রজাশীল এক মহান ধীমান ব্যক্তিত্ব, অপ্রকম্পিত চিত্ত ও অবর্ণনীয় মনুষ্যত্ব।
সদাই সকলে তুমি দিয়েছিলে তাড়া
মানুষ করিতে তারে মনুষ্যত্বে খাড়া। একবার কেঁদেছিলে মানুষ গেলে শতবার কাঁদিয়াছ মনুষ্যত্ব ম'লে। মানুষের মনুষ্যত্বে দিয়েছিলে তাড়া দেখোনি মানুষ কভু মনুষ্যত্ব ছাড়া। মানুষ হিসাবে হযরত মহম্মদ (দঃ) কেন আজ আকাশের ধ্রুব-নক্ষত্রের ন্যায় সারা বিশ্ব- মানবের চোখে চির স্থিতপ্রাজ্ঞ। এ কথার সদুত্তর পেতে গেলে আমরা লক্ষা করি, তিনি তাঁর আপন জীবনে আত্মার গভীর দেশে অবতরণ করে মহাসত্যের যেমন সন্ধান করেছিলেন, ঠিক অনুরূপভাবে জীবন-জিজ্ঞাসার অভাবনীয় স্তরে উন্নীত হয়ে আপন দোষ-ত্রুটি এবং দুর্বলতারও অনুসন্ধান করেছিলেন। এই জীবন-জিজ্ঞাসা ও আত্মোপলব্ধির শক্তি সঞ্চয় করতেও তাঁকে নিরন্তর কঠোর সাধনা ও কঠিন তপস্যাও করতে হয়েছিল। এইরূপ এক অচিন্ত্যনীয় শক্তি জয়ের পর তিনি হলেন এক অজেয় পৌরুষে ভূষিত মানব। এবার চরম দুঃখেও হলেন উদাস ও অনুদ্বিগ্ন, পরম সুখেও হলেন আত্মভুলা বিগত স্পৃহ, ভয়ঙ্কর ভয়েও হলেন অবিচল চিত্ত, যেন সবার নিকট করুণার আধার, অসহায়ের সহায়, নিরাশ্রয়ের আশ্রয়। সবার উর্দ্ধে ষড়রিপু আজ তাঁর নিকট দাসরূপে আনুগত্য স্বীকার করল। আকাশে বাতাসে সমগ্র সৃষ্টি জগতে মানুষের জয়, মানবতার জয় ঘোষিত হলো। সদাই জাগ্রত ছিলে সব দুখে সুখে সহিতে সকল কিছু সদা হাসি মুখে।
পেয়েছিলে দেখিবারে হেন ক্ষমতা
সহজে নিজের দোষ নিজ-দুর্বলতা।
যে জন অক্ষম এই জীবন-জিজ্ঞাসায়
পড়ে না তাহার মন প্রভু মহিমায়। যাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল চির প্রসার্যমান শুধু বিরলতমই নয়, সারা বিশ্বের সর্বকালের সর্ব সমাজের একটি অতীব বিস্ময়কর ঘটনা ও দৃষ্টান্তবিহীন এক অদ্বিতীয় উপমা।
