বাউল শব্দের আভিধানিক অর্থ তিনভাবে করা হয়েছে। ১. ধর্ম বা সাধক সম্প্রদায়বিশেষ; একটি গায়ক সম্প্রদায়, ২. সংগীতের সুরবিশেষ, ৩. পাগল, ক্ষ্যাপা। সংস্কৃতে বাউল শব্দটিকে দেখানো হয়েছে এভাবে- বৌদ্ধ তান্ত্রিক বজ্রীকুল > বজ্জীউল > বাজুল > বাউল > বাতুল।
বাউল শব্দের অর্থ নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। কোন কোন মতে বায়ু শব্দের সঙ্গে 'আছে' এই অর্থ বোধক 'ল' প্রত্যয় যোগে 'বাউল' শব্দের সৃষ্টি। এই 'বায়ু' শব্দের অর্থ যোগশাস্ত্রের স্নায়ুবিক শক্তির সঞ্চার বোঝায়। যে সম্প্রদায় দেহের স্নায়ুবিক শক্তির সঞ্চার সাধনের জন্য সাধনা করে তাঁরাই বাউল। ইস্টের জন্য 'ব্যাকুল' এই অর্থে ব্যাকুল থেকে বাউল শব্দটি রূপান্তরিত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কেউ কেউ মনে করেন সংস্কৃত 'বাতুল' শব্দের প্রাকৃতরূপ 'বাউল'। যাঁরা বাতাধিক তাঁরা পাগল, যাদের আচরণ সাধারণের তুল্য নয়। লোকে তাঁদের পাগল বা বাতুল বলে। এইরূপ সাধারণ সমাজ বহির্ভূত আচার ব্যবহার সম্পন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ই বাউল। বস্তুতঃ বাউল ভাবের পাগল, রসের সাধক। এই অর্থে 'বাউরা' (অর্থ পাগল) কথাটির সংগে ধ্বনি ও ভাবসাদৃশ্য রয়েছে। এই 'বাওরা' শব্দটিও বাউল বা বাতুলের অপভ্রংশ। বাউল শব্দের সমার্থবোধক অপর শব্দ হলো 'আউল'। বর্তমানে বাউল সম্প্রদায়ভূক্ত এক শ্রেণির মুসলমান সাধকদের (সুফীধর্ম প্রভাবিত) আউল বা আউলিয়া বলে অভিহিত করা হয়।
হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাউলগান এই সহজ সাধনায় বিশ্বাসী- তাঁদের হৃদয়ই বৃন্দাবন-কাশী, মক্কা-মদিনা, আল্লাহ্ বা ভগবান থেকেই পৃথিবীর সৃষ্টি। সকল মানবের মধ্যেই আছে এই ঈশ্বরের সত্ত্বা। আত্মারূপী আল্লাহই বাউলের কাছে সহজ মানুষ বা মনের মানুষ। অন্যদিকে সুফীদের সাধনা ও বৈষ্ণব সাধনার সঙ্গেও বাউল সাধনার মিল আছে।
বাউলগণ প্রচলিত হিন্দু বা মুসলিম আচার-বিচারের অনুসারী নয়। সংগীত এঁদের সাধনার এক প্রধান অঙ্গ। বাউল কবিদের মধ্যে প্রখ্যাত হলো লালন। অন্যান্য প্রসিদ্ধ বাউল কবিদের মধ্যে ছিলেন উত্তর বঙ্গের গঙ্গারাম, জগাকৈবর্ত, পদ্মলোচন, বিশা ভূঁইমালী, কাঙ্গালী ও সিরাজ সাঁই, সিলেটের বিজয় সরকার, রাধারমণ দত্ত, মুনিরুদ্দিন ফকির, কুষ্টিয়া কুমারখালির হরিনাথ মজুমদার (কাঙ্গাল হরিনাথ) প্রমুখ।
বাউলদের প্রধানত দুটি ভাগ। গৃহী ও গৃহত্যাগী। গৃহত্যাগী বাউলরা ভিক্ষান্ন খেয়ে একতারা বাজিয়ে গান গায় আর মনের মানুষের সন্ধানে পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। অজানা অচেনা অধরা পরমাত্মা হলো তাদের সেই মনের মানুষ। তাঁকে 'অচিন পাখি', 'সোনার মানুষ', 'মনুরায়' ইত্যাদি নামেও তারা অভিহিত করে। অন্যদিকে গৃহী বাউলরা গৃহে বসবাস করেই তারা সাধন-ভজন করে।
[লক্ষ্যণীয় ব্যপার হলো, 'বাউল' শব্দের সাথে 'বাংলার বাউল' শব্দের একটি বিশেষ সাযুজ্য আছে। একটির নাম নিলে অপরটি চলে আসে। তারমানে অন্য ভাষায় কি এই সম্প্রদায়ের উপস্থিতি নেই?
ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী তাঁর 'লোকসংগীত' গ্রন্থে 'শ্রীকৃষ্ণ বিজয়' ও 'চৈতন্য চরিতামৃত' গ্রন্থে ব্যবহৃত 'বাউল' শব্দের ব্যবহার তুলে ধরেছেন।
মালধর বসুর (গুণরাজ খান) 'শ্রীকৃষ্ণ বিজয়'-এ 'বাউল' শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। 'শ্রীকৃষ্ণ বিজয়' পুথির (খ-পুথি, লিপিকাল ১২৪৮ সন) অতিরিক্ত অংশে 'বাউল' শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়:
"মুকুল (ত) মাথার চুল ন্যাংটা যেন বাউল
রাক্ষসে রাক্ষসে বুলে বনে।
বিকটান কাড়ি রায় বলে মাংস কাড়ি খায়
রক্ত পড়ে গলিয়া বদনে।"
পরবর্তীকালে, ষোল শতকের শেষদিকে রচিত 'চৈতন্য চরিতামৃত'-এ আদির ১২ পরিচ্ছেদে এই শব্দটি ব্যবহৃত হতে দেখা যায় :
"গোবিন্দেরে আজ্ঞা দিল- ইহাঁ আজি হোতে
বাউল্যা বিশ্বাসেরে না দিবে আসিতে।"
চণ্ডিদাসের ভনিতাযুক্ত বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব ও সাধন প্রণালী সমন্বিত 'রাগাত্বিকা' পদের মধ্যেও বাউল শব্দটির ব্যবহার দেখা যায় :
"শুন মাতা ধর্ম মতি বাউল হইনু অতি কেমনে সুবুদ্ধি হবে প্রাণী।”
