ভাবসংগীত ও মরমিসংগীতের ধারায় সংযোজন
“লোকে বলে আমার ঘরে নাকি চাঁদ উঠেছে' আরিফ দেওয়ানের গাওয়া এই গানটি বাংলাদেশ বেতারে অজস্রবার শুনেছি । গানটি কে লিখেছে, তা জানার সুযোগ পেয়েছি অনেক পরে। ধরেই নিয়েছিলাম যে এটি কোনো সাধকগীতিকবির রচনা। চাঁদ আর বস্তুর প্রতীক-রূপকে এই যে গান, তা কেবল আমাদের সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ লোককবিদেরই সাধনার ফসল। শিল্পী আরিফ দেওয়ানের কন্ঠে শুনেছি 'আমি পাইলাম না দরদিয়া শ্যাম' গানটি। বন্ধু ও সংগীত-গবেষক শাকির দেওয়ানের কাছ থেকে জেনেছিলাম এই দুটি গানের গীতিকারে নাম ক্বারী আমীর উদ্দিন আহমদ। তারপর শিল্পী আরিফ দেওয়ানের কাছে শুনেছি তাঁর গানের কথা। এরপর ক্বারী আমীর উদ্দিনের প্রতি আমার আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকে ।
কারীয়ানা পরীক্ষা পাস করে 'কারী' উপাধি অর্জনকারী সুনামগঞ্জের আলমপুর গ্রামের রওশন আলী থেকে ক্বারী আমীর উদ্দিন আহমদ হয়ে ওঠা, মসজিদের ইমাম থেকে আজ লন্ডনপ্রবাসী ও সমাজসেবী হয়ে ওঠা কিংবা গ্রামের মজলিসে শখের শিল্পী থেকে দেশ-বিদেশের মঞ্চে গান গাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের পেছনে যে গুণটি ক্রিয়াশীল তা হল সাধনা এবং নিরন্তর সাধনা। সেই সাধনা তিনি সুদূর প্রবাসে বসেও চালিয়ে
১৯৪৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া এই গীতিকবির পিতার নাম শাহ মুহাম্মদ রুস্তম আলী শেখ মাতা আলিফজান বিবি। পূর্বসূরীরা ফকিরি ধারার লোক ছিলেন । পিতা-মাতার মতো সংগীতের অনুরাগ তাঁর রক্তেই প্রবাহিত ছিল । ছোটবেলায় গান গাইতেন । পিতার সায় ছিল তাতে। বলা যেতে পারে পিতার প্রেরণাতেই গানের ভুবনে আসা । ছোটবেলা থেকে বাঁশি, কাসি, ঢোল, একতারা, বেহালা, হারমোনিয়াম, তবলা বাজানো আয়ত্ত করলেন দেখে-দেখে শুনে-শুনে । এই সময় তিনি গান গাইতেন সিলেট অঞ্চলের হাসন রাজা, রাধারমণ, দ্বিজদাস ঠাকুর, সৈয়দ শাহনুর, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ, দুর্বিন শাহ, মওলানা ইয়াসিন প্রমুখ পূর্বসূরী মহাজনের। ষাটের দশকের শুরু থেকে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হন এবং নিজেই গান রচনা শুরু করেন সেই থেকে লেখা শুরু করে এ যাবত তাঁর গানের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে ।
পৌরনের ক
বড় আনন্দের কথা।
একসময় পালা এবং মালজোড়া গান করতেন আমীর উদ্দিন । প্রতিপক্ষ শিল্পীকে ঘায়েল করতে তাঁর জুড়ি ছিল না তখন । কামাল উদ্দিন, শাহ আব্দুল করিম, দুর্বিন শাহ, আবেদ আলী, কফিলউদ্দিন, রজ্জব আলী দেওয়ান, আব্দুর রহমান বয়াতি প্রমুখ শিল্পীর সঙ্গে একই আসরে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। সিলেট অঞ্চলে তাঁর প্রচুর ভক্ত-শিষ্য আছে ৷ একসময় তিনি উগ্র মৌলবাদিদের রোষানলে পড়ে প্রবাসজীবন বেছে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু গানের নেশা তাঁকে ছাড়ে নাই। এখনও নিয়মিত গান রচনা করছেন, সুর সংযোজন করছেন এবং কন্ঠ দিচ্ছেন। দেশের বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে রুনা লায়লা, আরিফ দেওয়ান, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ফকির শাহাবুদ্দীন, রণেশ ঠাকুর, বেবী নাজনীন, অণিমা মুক্তি গমেজ, মমতাজ বেগম, আসিফ আকবর, কাজল দেওয়ান, শাহনাজ বেলী, আশিক, রেশমা সুইটি, সুনামগঞ্জের দেবদাস চৌধুরী, তুলিকা ঘোষ চৌধুরী, রশিদউদ্দিন, তছকির আলী, ইকরামউদ্দিন, সিরাজউদ্দিন প্রমুখ শিল্পীর কণ্ঠে ক্বারী আমীর উদ্দিনের গান এখনও গীত হয়ে চলছে। এছাড়া এলাকায় যাঁরা বাউলগান খুঁজছেন তাঁদের কাছেও আকর্ষণীয় তাঁর গান। নতুন শিল্পীদের অনেকেই গাইছেন তাঁর গান ।
'লোকে বলে আমার ঘরে নাকি চাঁদ উঠেছে' ছাড়াও তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে, 'শাহজালালের পূণ্যভূমির নাম জালাল শরীফ', 'হেলায় হেলায় দিন ফুরাইলো সই', 'মন কাড়িয়া নিলো গো প্রাণ কাড়িয়া নিলো সখি', 'মায়া লাগাইয়ারে বন্ধু এতো লাঞ্ছনা', 'যদি ভালবাস না, কাছেও আস না দেখেও দেখো না, কোনো দিন', “শিখাইয়া পিরিতি করিল ডাকাতি’, 'আগে ভক্তির চুলা বানাও, সবুরের হাঁড়ি বসাও', 'আমারে খুঁজিয়া দেখি আমি নাই', 'কে এমন চাঁদরূপসী, জাদুভরা মুখের হাসি' প্রভৃতি মানুষের মুখে-মুখে ফেরে। তাঁর গান নিয়ে 'গুলজারে মারেফাত', 'বিরহের উচ্ছ্বাস', 'প্রেমের জগত', প্রকাশিত হয়েছে । ক্বারী আমীর উদ্দিনের গান নিয়ে 'আমিরী সংগীত' বেরিয়েছে ২ খণ্ডে। এবার প্রকাশিত হলো তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড । এভাবে তাঁর সকল গান প্রকাশিত ও গ্রন্থিত হলে বাংলা মরমি গানের ধারার সমৃদ্ধি অনুভব করা যাবে। আমরা সেই অপেক্ষায় রয়েছি ।
বাংলা লোকসংগীতে আত্মনিবেদনের বাণীতে ভরপুর থাকে। কারী আমীর উদ্দিনও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর একটি গানে আছে -
'আমি যাহা বুঝি না গো তুমি বুঝাইবায়নি
তোমার গান গাইতে দিবায়নি
আমার এই ফরিয়াদ তোমার চরণে রাখবায়নি।
দয়াল গো.. ভাষাজ্ঞান নাই যে আমার
নিবেদন শুনবায়নি ।
দূর করিয়া দীলের আঁধার, দীদার দেখাইবায়নি।'