উকিল মুনশির বিচরণক্ষেত্র ছিল নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ পুরো হাওরাঞ্চল। তাঁর সুললিত কণ্ঠের বিচ্ছেদ শোনার জন্য রাতের পর রাত জেগে থাকত হাওরের মানুষ। উকিলের গানের আসরের খবর মুখে-মুখে ছড়িয়ে যেত এ গ্রাম থেকে ও গ্রাম। গ্রামের যে উঠোনে আসর বসত সেখানে তিল- ধারণের ঠাই থাকত না। লোকে লোকারণ্য হতো উকিলের গান শোনার সম্মোহনী আকর্ষণে। গান গাইতে গাইতে কাঁদতেন এবং দর্শক- শ্রোতাদেরও কাঁদাতেন। উকিলের গানের এমনই বুননশৈলী আর মায়াবী টান, যা শোনামাত্র শ্রোতাদের বিষাদগ্রস্ত হওয়াটা ছিল অনিবার্য।
বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি শত-সহস্র নদ-নদী- খাল-বিল। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব জলাধার সুতোর মতো পেঁচিয়ে রেখেছে পুরো দেশকে। এরও বাইরে দেশের সাতটি জেলার বিস্তৃত রয়েছে অসংখ্য হাওর। যে অঞ্চলের বাসিন্দারা ছয় মাস পানিবন্দী থাকেন। এ ছয়মাস হাওরের অবারিত পানির উতরোলে মানুষের ভাসমান জীবন পানির ঢেউয়ের মতন কখনো অশান্ত, দুর্বার — আবার কখনো শান্ত। সেই জনপদেই জন্ম নিয়েছিলেন উকিল মুনশি।
নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরি উপজেলার নুরপুর বোয়ালী নামক যে গ্রামটিতে উকিলের জন্ম, বর্ষায় সেই গ্রাম কাঁপিয়ে দেয় হাওরের ঢেউ। পানির সঙ্গে নিত্য যুদ্ধ করেই বেঁচেবর্তে থাকেন গ্রামের বাসিন্দারা। শুকনো মৌসুমে সেই বাসিন্দারাই কাকডাকা ভোরে লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেন ধানী জমির দিকে। সংগ্রামমুখর জীবনের এসব দৃশ্য দেখতে-দেখতেই বড়ো হয়েছেন উকিল। মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করেছেন এবং সেখান থেকে জুগিয়েছেন গানের রসদ। হাওরবাসীর বেদনাবিদুর জীবনের নির্যাসটুকুই তাঁর গানের প্রাণ, তাঁর গানের ভিন্নতা।
উকিল মুনশির গানের উৎসভূমি মূলত হাওর। সেখানকার মনোলোভা প্রাকৃতিক দৃশ্য যে-কাউকেই শিল্পী-বাউল করে তোলে। বিশ শতকের বাউল উকিল সেই ধারাবাহিকতারই ফসল। তত্ত্ববাণীনির্ভর কোনো পদবালি নয় বরং হাওরের লিলুয়া বাতাসের মতন যেন পরশ বুলিয়ে যায়। উকিলের গান। কখনো উত্তাল কখনো শান্ত হাওরের পানির গতির এই
