বর্তমান যান্ত্রিককালে ইসলামি রাষ্ট্রের স্বরূপ কেমন হইতে হইবে তাহার রূপরেখা আল-কোরআন ও সুন্নাহ হইতে সঠিক বুঝিয়া লইবার প্রয়োজন রহিয়াছে অত্যধিক। অবশ্য অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ ইহার সম্যক পরিচয় দান করিতে পারিবে না। বিষয়টির উপর চিন্তা প্রয়োগ করিয়া আল-কোরআনের পাঠকগণ যাহাতে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে পারেন সেই উদ্দেশ্যে উহার কয়েকটি দিক উল্লেখ করিয়া সেগুলির উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হইল। বিষয়টির বিস্তারিত ভাব ও বিশ্লেষণ পাঠকের নিজস্ব ব্যাপার বলিয়াই মনে করি।
রাশেদ চৌধুরী রচিত 'নারী পুরুষ ও শাসন' নামক প্রবন্ধটি ইহার সম্পূরক। সুতরাং এই প্রবন্ধটি ইহার সঙ্গে জুড়িয়া দেওয়া হইল ।
ইসলাম কোনো নূতন ধর্ম নয় । ধর্মের এই নাম পূর্ব হইতেই চলিয়া আসিতেছে। যেমন হজরত ইব্রাহিম নবি তাঁর প্রচারিত ধর্মকে ‘ইসলাম ধর্ম' নামে আখ্যায়িত করিয়াছিলেন। সকল নবির প্রচারিত ধর্মই ইসলাম ধর্ম। অর্থাৎ 'আল্লাহ রাব্বুল আলামিন-এর নিকট আত্মসমর্পণের ধর্ম। কেবলমাত্র মোহাম্মদি ইসলামকেই আমরা ইসলাম ধর্ম' নামে আখ্যায়িত করিয়া আসিতেছি, যদিও কালের প্রবাহে ইহার মধ্যে মোহাম্মদি বৈশিষ্ট্য অল্পই রহিয়াছে।
ইসলামের মৌলিক বিধান
ইসলাম ধর্মের কয়েকটি মৌলিক বিধান যাহা পালন না করিলে মুসলমান হওয়া যায় না এবং ইসলামি সমাজ সংগঠন হয় না :
সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থা থাকিবে না। যেহেতু সুদের পরিমাণ যাহাই হউক না কেন উহা ইসলামে হারাম বা অবৈধ। এর মূল কারণ হইল ইসলামি সমাজ শোষণহীন একটি সমাজ। আর সুদ শোষণের একটি হাতিয়ার।
বণ্টন-সাম্য অবশ্য থাকিতে হইবে। কারণ জন্মগতভাবে সবার বাঁচার অধিকার সমান। ইসলামি ব্যবস্থার যে সমাজতান্ত্রিক রূপ অঙ্কিত করা আছে তাহা বর্তমান বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা হইতে সর্বদিক হইতে অনেক অনেক উন্নত। অবশ্য এই কথা সত্য যে, ইসলামিক ব্যবস্থা কোনোকালেই প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে নাই । রাসূলুল্লাহ উহা প্রতিষ্ঠা করার সকল আয়োজন সমাপ্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার জীবদ্দশায় উহা সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা করিয়া যাইতে পারেন নাই। ভবিষ্যতে তাহা প্রতিষ্ঠা করিবার যোগ্য নেতা বা প্রতিনিধি ও তাহার সমর্থক দল তৈরি করিয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার দেহত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই জনগণ সেই নেতৃত্ব অমান্য করিয়া ইসলামিক বিধি-বিধান সমাজে প্রতিষ্ঠিত করিল না। নিজেদের স্বেচ্ছাচারী শাসন প্রতিষ্ঠার কাজে মত্ত হইয়া গেল। তেইশ বছরের খেলাফতের পর রাসূলের মনোনীত নেতা ঘটনাচক্রে ক্ষমতায় আসিলেও জনগণের সমর্থনের অভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করিতে তিনিও পারেন নাই। তাঁহাকে নিহত করিয়া তাঁর প্রচেষ্টার ইতি টানা হইয়াছিল। এই কারণেই ইসলামি রাষ্ট্রের কোনো দিকেরই একটি বাস্তব প্রতিষ্ঠিত নিদর্শন দেখানো সম্ভব হইয়া উঠে নাই। এই কারণে কোরানে লিখিত ইসলামিক রাষ্ট্রের নিদর্শন ছাড়া বাস্তব কোনো নিদর্শন দ্রষ্টব্য হিসাবে অর্থাৎ উদাহরণ রূপে জগতে নাই। (দ্রষ্টব্য: প্রবন্ধ শেষে 'বণ্টন-সাম্য')
রাজতন্ত্র ইসলামে নিষিদ্ধ। (কোরানে আল্লাহকেই মানুষের রাজা বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে । রাজতন্ত্র বলিতে আমরা মানুষের একনায়কত্ব বুঝি, তাহা বংশগত একনায়কত্ব হউক বা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত একনায়কত্ব হোক। এইরূপ একনায়কত্ব ইসলামে নিষিদ্ধ । আল্লাহ ও তাঁহার রসুলের প্রতিনিধি স্থানীয় মোমিনের একনায়কত্বই হইল কোরানের ব্যবস্থা। কারণ মোমিনের শাসন আল্লাহরই শাসন। আল্লাহর ইচ্ছা সমাজে কার্যকর করিয়া তুলিবার মতো ধারা বুঝিবার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাই এবং উহার প্রতি তাহাদের শ্রদ্ধাবোধও থাকে না। থাকে শুধু মোমিনের।