বাংলা প্রকাশনা শিল্পে নবতর ধারা প্রবর্তনার তাগিদ থেকেই রোদেলা'র অভিযাত্রা শুরু অতিসাম্প্রতিক কালে। গত দু'বছরে আমরা তার প্রস্তুতিমূলক ভিত্ দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছি। এদেশের প্রাগ্রসর চিন্তক, কবি, শিল্পী, লেখক, পাঠক ও সমালোচকদের অকুণ্ঠ সাহায্য-সহযোগিতা আমাদের এক্ষেত্রে নানাভাবে অনুপ্রাণিত ও সমৃদ্ধ করেছে। তাঁদের প্রতি রোদেলা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
আনন্দের সমাচার, এ বছর আমরা আমাদের প্রকাশনার শীর্ষ বিষয়রূপে নির্বাচন করেছি সুফি সম্রাট ফকির লালন শাহ'র তত্ত্বসাহিত্য ও তাঁর তত্ত্বদর্শনকে। কারণ এ পুরুষোত্তম মহাবীরের প্রকৃত অনুসন্ধান ও যথার্থ মূল্যায়ন ইতোপূর্বে হয়নি। খণ্ডিত ধারায় বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই লালন গবেষণা ও প্রকাশনা করলেও সেগুলো প্রায় সবই বিতর্কিত এবং খণ্ডিত। লালন শাহ'র বিশালতা ও গভীরতার বিচারে যা নিতান্ত অবমাননাকর। বৃহত্তর বাংলার বাইরে পাশ্চাত্যের জ্ঞানচর্চা জগতে ইদানিং কোনো কোনো পণ্ডিত শাঁইজি সম্বন্ধে বেশ জোরে শোরে মাতামাতি আরম্ভ করলেই খণ্ডবুদ্ধি ও বিভ্রান্তির ঊর্ধ্বে
উঠতে পারেননি।
এ সত্য কেউ অগ্রাহ্য করতে পারেন না যে, সাধুগুরু লালনবিষয়ে শতবর্ষ ধরে চলে আসা গণ্ডীবদ্ধ ও গড্ডালিকা ধারার অনুসন্ধান এবং গবেষণার বিপরীতে কবি আবদেল মাননানই সর্বপ্রথম শাঁইজির সর্বকালীন সর্বজনীন পরিচয় পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার সৎসাহস দেখিয়েছেন। মাননান মূলত তাঁর পরম পূজ্যবাদ সুফি গুরু সদর উদ্দিন আহমদ চিশতীর নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণায় আত্মদর্শনমূলক মৌলিক লালনদর্শনকে জগতবাসীর কাছে পরিচিত করিয়েছেন। এজন্যে তাঁকে সব আত্মসুখ-স্বচ্ছলতা বিসর্জন দিতে হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক খ্যাতি বা বৈষয়িক লাভালাভের মোহমাখা হাতছানি উপেক্ষা করে বছরের পর বছর নীরবে সাধনা করতে হয়েছে। বৃহত্তর নদীয়া অঞ্চলে ফকির- বৈষ্ণব-মোহান্তগণের সান্নিধ্যে অজস্র সাধুসঙ্গে ডুবে বছরের পর বছর তিনি মানবীয় ক্ষুদ্র আমিত্বকে ধ্বংস করেছেন গুরুবাক্য শিরোধার্য জেনে।
লালনদর্শন সৃষ্টিরহস্য প্রকাশক মহাবিশ্বদর্শন। সৃষ্টি ও স্রষ্টার একত্ব বা অখগুত্ব প্রমাণ যার মূল দিগদর্শন। আত্মদর্শনের ধ্যানসাধনাই প্রকৃত সদজ্ঞান বা প্রজ্ঞালাভের পথ। শাঁইজি নিজেই যার পথিক, পথ, পদ্ধতি ও পদ্ধতিপ্রণেতা ক্ষণস্থায়ী জীবনে কোথাও কিছু থেমে নেই অচল বা স্থির হয়ে নেই। সবই পরিবর্তনের মধ্যে বিকাশমান। কেবল নবি, কবি, মহাপুরুষের অভিব্যক্তি জায়মান থেকে যায় কবিতার ছন্দবন্ধে, সুরের ফল্গুধারায়, প্রেমিকের হৃদয় কাবায় । আর সব কালের গ্রাসে বিলীন হয়ে গেলেও এর ক্ষয় নেই কোনো কালে । সদাদীপ্ত এ নূর ও সুরের ধারা অক্ষয়। কালের বিস্মৃতি অতিক্রম করে তাঁর বিস্ময়কর বেঁচে থাকা। হাজারো বছর পেরিয়ে আবার তা বেজে ওঠে কোন্ অন্তরগুহা থেকে ধরা কঠিন। দুশো কি দুহাজার বছর তখন আর ধর্তব্যে পড়ে না। লালনসঙ্গীত এমনই কালজয়ী। কখন কাকে ধরে কোথায় টান দেয় তা টের পাওয়া মুশকিল । ফকির লালন শাহ যে অভিনব ভাষা-বাক্যে আপন মহাভাব গানের উঁচুপর্দায় বাঁধেন তা সরল-সদামাঠা বাংলা ভাষা নয় মোটেই; অন্য ভাব, আরেক জগতের ভাষা। তিনি কোথায় ছুঁয়ে যান সেটা বুঝে ওঠার আগেই ভাবুকের ভাবান্তর ঘটে যায়। শুনে পড়ে বুঝতে গেলে ভারি ধাঁধা লাগে। তাঁর ভাষা-বাক্য সুরের সূক্ষ্ম সুতোর উপর ভর করে কোথায় যেন আমাদের টেনে তুলতে চায়। অত্যন্ত রহস্যময় তাঁর ভাব, রূপ, রেখা ও রঙ। জেগে ওঠে দ্বন্দ্ব ও প্রশ্ন, নানা বিভ্রমসহ অসংখ্য অভিঘাত। সাধারণের চটে ফেটে যাওয়ার দশা যেখানে সেখানেই তো
সাধু রসামৃতের গভীর আস্বাদ।
আ মরি সাধুগুরুর মনের ভাব ও সাধের ভাষা। সেজন্য আমাদের ঐতিহ্যে গুরুবিহীন সঙ্গীতচর্চা যেমন হতে পারে না, তেমনই হৃদয়ঙ্গম হতে পারে না তার সঠিক ভাব ও অনুভব । গুরুবিনে লালনজগতে কোনো ভাব নেই, ভাষা তো আরো দূরের ব্যাপার । এছাড়া যা হয় সবই তা না না না ।
জগতে লালনচর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারেনি কোথাও। গত দুহাজার বছর যাবৎ সাম্রাজ্যবাদী ধর্মপ্রথা-শাসন ব্যবস্থা বিশ্বের কোথাও কোনো মহাপুরুষকে মাথা তুলে দাঁড়াতেই দেয়নি। মহৎ সত্যকে ওরা ক্রুশবিদ্ধ করে, ধড় থেকে মাথা কেটে বর্ণায় গেঁথে বারবার কারবালা ঘটায়। তাই ফকির লালন। শাহের সর্বকালীন-সর্বজনীন শুদ্ধদর্শনও সত্যিকার অর্থে কোথাও মূল্যায়িত হবার সুযোগ ঘটেনি। মূল্যায়নের ধুয়ো তুলে যা হয়েছে তার সিংহভাগই অবমূল্যায়নের