ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমন ঘটে সেই সপ্তম শতাব্দীর আরব দিগ্বিজয়ের প্রায় সাথে সাথে। তবে প্রাক-ইসলামি যুগ থেকেই শত শত বছর ধরে এ অঞ্চলে আরব বণিকদের যাতায়াত ছিলো। তাই আরব বণিকদের এতদঞ্চলের স্থানীয় জনগণ যেভাবে স্বাগত জানিয়ে আসছিলো, মুসলিম রূপেও তাদেরকে তেমনি স্বাগত জানায়। অবশ্য ভারতবর্ষে মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে আগমন ঘটে আরও পরে। অষ্টম শতকের সূচনাকালে উমাইয়া বংশের খলিফা প্রথম ওয়ালিদের শাসনকালে আরব সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর শাসনকর্তা হাজ্জাজ ইবনে ইইসুফের নির্দেশে তাঁর সেনাধ্যক্ষ মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু আক্রমণ করেন এবং সিন্ধুর রাজা দাহিরকে পরাজিত করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম আরবীয় মুসলমানদের শাসন
প্রতিষ্ঠা করেন ।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু আক্রমণ কোনো আকস্মিক ঘটনা বা দৈব- ঘটিত সামরিক অভিযান ছিলো না। আরবে মুসলমানদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় টহলদার ও জরিপ অভিযাত্রীদলের তরীবহর বাণিজ্যব্যাপদেশে ভারত উপমহাদেশে আসা আরব বণিকদের অনুসরণ করতো। তারই সূত্র ধরে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলেই সমুদ্রপথে কঙ্কন উপকূলে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। এরই সুবাদে বাণিজ্যপোতের প্রহরায় নিয়োজিত সশস্ত্র পোতসমূহ উপকূলবর্তী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়। অতঃপর মাক্রান সীমান্ত থেকে পরিচালিত পরীক্ষামূলক অভিযানসমূহ চূড়ান্ত পর্যায়ে 'কাবুল ও যাবুল' সীমান্ত রাজ্যের অভ্যন্তর দিয়ে প্রত্যয়দৃপ্ত অগ্রগতি লাভ করে এবং মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয় অভিযান পূর্ণতা পায় । তবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এ বিজয় খুব একটা ফলপ্রসূ হয় নি। কারণ ভারতে ইসলামকে একটি রাজনৈতিক শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা করার সৌভাগ্য মুহাম্মদ বিন কাসিম বা আরবদের হয় নি। ভারত উপমহাদেশের মাত্র একটি প্রান্তেই এর প্রভাব সীমিত ছিল এবং এর ফলে যে ক্ষীণ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলো তা অচিরেই স্তিমিত হয়ে যায়। আরবগণ শীঘ্রই এ অঞ্চলে ক্ষমতাচ্যুত হতে থাকে। ভৌগলিক বাধাসমূহ উপমহাদেশে তাদের ক্ষমতা বিস্তার বিঘ্নিত করে এবং দশম শতাব্দীর মধ্যে আরবদের সেই দিগ্বিজয়ী ভূমিকার অবসান ঘটে ।
গোলামকে তাঁর সেনাদলের অন্তর্ভুক্ত করেন। এ সময় থেকেই তুর্কি গোলার প্রশাসনে শক্তিশালী হতে থাকে এবং এদেরই একজন আলবতেলিন সাদাসি রাজদরবারের জেনারেল পর্যায়ে পৌঁছে। পরবর্তীতে খ্রিস্টাব্দে তাঁর পুর সবুক্তেগিন নুহ বিন মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে খোরাসানে স্বীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং ৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সবুজেগিনের পুত্র মাহমুদ বিন কপিন এই শাসন ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করে তুলেন। যা ইসলামের ইতিহাসে পানি শাসন নামে খ্যাত। একাদশ শতাব্দীতে এই মাহমুদ বিন সবুজেপিনের শাসনামলেই ভারতবর্ষের উত্তরাঞ্চলে মুসলমানদের বিজয়াভিযান শুরু হয়।
অষ্টম শতাব্দী থেকেই গোষ্ঠীগত কোন্দলসহ নানা রাজনৈতিক ও সামরিক কারণে মধ্যএশীয় গোষ্ঠীসমূহ সমুদ্রের ঢেউয়ের ন্যায় একের পর এক দেশত্যাগ করতে শুরু করে এবং সেলজুক, ঘুষ, খিতাই, ইলবারী ও কারলুপ নামীয় তুর্কি গোত্রসমূহ ইসলামি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তারা রাজ্য ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং পশ্চাদ্দিক থেকে চাপের মুখে নতি স্বীকার করে ক্রমাগত অগ্রসর হতে থাকে। এভাবে তারা ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান ও ভারতে আধিপত্য স্থাপন করে। দশম শতাব্দীর মধ্যে তুর্কিগণ সিন্ধুর অপর পাড়ে ভারতীয় ভূখপ্তস্থিত কাবুলের হিন্দুশাহীয় রাজ্যের সাথে সামরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং গজনি রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর কিঞ্চিৎ অধিক অর্ধ শতাব্দীকালের মধ্যে ওই রাজ্যকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে রাভী নদী পর্যন্ত তুর্কি আধিপত্য বিস্তৃত করে। এভাবেই সিন্ধুনদের পূর্বে একটি মুসলিম শক্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং সিন্ধুর আরব উপনিবেশবাদীগণ যা পারে নি, ভারতে সেই ভৌগলিক বাধা অতিক্রম করার সুযোগ ও সামর্থ্য দুইই লাভ করে তুর্কিগণ গঙ্গা উপত্যকার প্রবেশপথে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় দু'শতাব্দীকাল গজনভি সুলতানগণ পাঞ্জাব শাসন করে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে স্থায়ী আসন লাভ করে। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় হিন্দুস্তান। ফলে ভারতীয় রাজন্যবর্গ গভীরভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
তবে গজনভিদের সেই প্রতাপ অবশ্য বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। মাহমুদ থেকে তৃতীয় প্রজন্মে তাঁর মধ্য এশীয় সাম্রাজ্য সেলজুকগণ ধ্বংস করে দেয়। তুর্কিস্তান থেকে নব্য আক্রমণকারীর আগমন, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, শাসকদের অযোগ্যতা ও পূর্বতন সামন্তরাজ্য ঘোরের পার্বত্য অঞ্চলবাসী শানসাবানি