হস্তিনাপুর নামে এক রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন বিচিত্রবীর্য। রাজা বিচিত্রবীর্যের দুই পুত্র ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। এই দুটি পক্ষ থেকে দ্বাপর যুগের ঘটনা সংঘটিত হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন জন্মান্ধ। তার ছিল শত পুত্র। জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন দুর্যোধন। অন্যদিকে বিচিত্রবীর্যের ছোটো ছেলে পাণ্ডু, তার ছিল পাঁচ পুত্র যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব। এই পাঁচ পুত্র পরবর্তী সমাজে পাণ্ডব বংশ আর শতপুত্ররা পরবর্তী সময়ে কৌরব বংশ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই দুই বংশের মাঝে জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র রাজা হতে পারেনি। রাজা হওয়ার জন্য পরবর্তী সময় তারা যুদ্ধজীবন বেছে নিয়েছে, তাতে কুরুক্ষেত্র শব্দটি পরিচিতি লাভ করে। এই উভয় দলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই ভগবান একমাত্র অর্জুনের রথের সারথী হন।
লেখকের মনের ভাব প্রকাশ হলো, আমরা কুরুক্ষেত্রকে জীবন দর্শন মনে করি। ধর্ম ইতিহাস আমাদেরকে গল্প শিক্ষা দেয়নি বরং মুক্তির পথ দিয়েছে। জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র দিয়ে আমরা আমাদের আমিত্বকে জানব। পাণ্ডব হচ্ছে আত্মজ্ঞান। পঞ্চপাণ্ডব হচ্ছে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ব্যোম । আঠারো মোকামের দেহে আত্মদর্শন লাভ করার জন্যই ১৮ দিনের যুদ্ধ ময়দান কুরুক্ষেত্র তৈরি হয়েছে- যার পাথেয় হচ্ছে গীতা।
বাইরে পা ফেলে যায়। হরণ করেন। পড়ে যায়। ভক্তকে যখন শুরু নাম ও করে। এই সংস্কার প
জন্য হবে না।
গীতা অত্যন্ত সহজ গ্রন্থ। সুমধুর, বিজ্ঞানময় গ্রন্থ । গীতাই একমাত্র গ্রন্থ যাকে পাথেয় করে আত্মদর্শন বা ভগবান দর্শন সহজে লাভ করা যায়। গীতা পাঠ করবেন তার কী উদ্দেশ্য, গীতার শেষ অধ্যায় 'মাহাত্ম্যম' যার মধ্যে অনেক লোভ দেখানো হয়েছে। তবু সাধু সমাবেশে বলা দরকার, গীতা পাঠের উদ্দেশ্য একমাত্র একটি- একমাত্র আত্মজ্ঞান লাভ করাই গীতা পাঠের উদ্দেশ্য হতে হবে। গীতায় একজন মাত্র বক্তা, একজন মাত্র শ্রোতা। কৃষ্ণ ভগবান নিজেই শুরু। অর্জুন এখানে ভক্তের অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকের দেহে অর্জুন (রূপ শব্দ) নিজেই ভক্ত হয়ে তার গুরুকে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীভগবান জ্ঞানে লাভ করতে হবে। পরম গুরুকে এ দেহে উদ্ভাসিত করে তার পরে গীতা চিন্তা করতে হবে।
শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বলছেন- শ্রীকৃষ্ণ ষোড়শ রমণী নিয়ে খেলছে। তত্ত্ব খুলে দেখা যায় যে, ষোড়শ নাড়ি বলতে গিয়ে নারী বলেননি, নাড়ি বলেছেন, এখানে দেহধারী কোনো নারীর কথা বলেনি। দেহের মাঝে নাড়ি আছে। এটা তত্ত্ব কথা। কেউ বলে এই দেহে ৭টি বা ৮টি নাড়ি। কেউ বলে ১৪টি, কেউ বলে ৩৩টি, আবার কেউ ৩৩ কোটি নাড়ির কথা বলে থাকেন। প্রত্যেকটি পরিশুদ্ধ দেহই গোপী পাড়া। এই গোপী পাড়ায় অসংখ্য নাড়ি বাস করে। তার মাঝে ১৬শ নাড়ি নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ খেলছেন। যা সাধারণ মানুষ চিন্তাও করতে পারবে না। গোপী পাড়ার শ্রেষ্ঠ গোপিনী হচ্ছে রাধা রানী। এই তত্ত্ব অনেক কঠিন। শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু নিজেই ছিলেন রাধারানি। তাঁর প্রিয়জন ছিল শ্রীকৃষ্ণ। এই প্রিয়জন তাঁর মাঝেই অন্তর্নিহিত ছিল। এটাই মূল তত্ত্ব। তাই রাধাকৃষ্ণ বলতে মহাপ্রভুকেই বুঝতে হবে। সর্বকালেই এরূপভাবে দুই অঙ্গ এক অঙ্গে পরিণত হয়। জগতের সব ধর্মের মধ্যেই রূপক থাকে। সবচেয়ে বড়ো বড়ো তত্ত্বগুলো যখন মানুষ বুঝাতে যায়, তখন রূপক শব্দের প্রয়োজন হয়। তত্ত্ব যখন প্রকাশ পায় তখন রূপকের মাধ্যম ধরে, রূপককাহিনিকে আত্মস্থ করার সময় রূপক বাদ দিয়ে আবার তত্ত্বে পরিণত করা দরকার।
শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণ অবতরণ হয়েছে শুধু কংসকে বধ করার জন্য। কংস ছিল অত্যাচারী রাজা, যিনি শিশু অবস্থায় কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য দুই ভক্তকে (বসুদেব ও দেবকী) কারাবন্দি করে রেখেছিল। এখানে কংসকে আমরা আমিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করব। মানুষের আমিত্ব মনের যে বুদ্ধি, তা সবসময়ই মানুষকে অহংকারে, হিংসায়, লোভে এবং কামের উত্তেজনায় রাখে। এভাবে নিজের মধ্যে লুকায়িত পরম সত্তাকে মেরে ফেলে। আমিত্ব সত্যকে বিকশিত হতে দেয় না। কারাবন্দি করে রাখে। এজন্য তত্ত্ব জানতে হবে, আত্মশুদ্ধি লাভ করতে হবে। নিজেই রাধা হতে হবে। কৃষ্ণ প্রেমে বিলীন হতে হবে। তবেই বৃন্দাবন লীলা বুঝা যাবে । রাধা হলে কৃষ্ণ প্রেম প্রাপ্তি হয়। প্রেম পেলে প্রেমে বৈচিত্র্য হবে। এর পরে প্রেমের মিলন আসবে। মিলনের অপেক্ষায় মান আসবে। মান থেকে অনুরাগ আসবে। গভীর অবস্থায় একদিন প্রেমের বিরহ প্রাপ্তি হতে পারে।
তখন বুঝা যাবে বিরহের দশ দশা কী?
প্রিয় পাঠক ও সাধু সমাবেশ ধর্মীয় পূজা অথবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে জীবন কাটিয়ে কখনো উল্লিখিত ভগবানের ধর্ম বুঝা যাবে না। আমরা একজন উপস্থিত গোঁসাই নেব, তা তপ-যপ করার জন্য নয়। শুধু ভক্তি আর দীক্ষা দেওয়ার জন্য নয়। তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা আর কর্ম বুঝে নেব। কর্ম করব। ধীরে ধীরে বৈকুণ্ঠের দিকে এগিয়ে যাব আর সব যুগের কথাগুলো আত্মদর্শন হিসেবে জানব এবং গুরুদেবের কাছ থেকে এভাবে সবকিছু বুঝে নেব।