পটভূমি
সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি যুগে যুগে কালে কালে মানব কল্যাণ সাধনে নবী-রাসুল, অলী-আবদাল, গাউস-কুতুব তথা সংস্কারক প্রেরণ করেছেন। নবুয়তের পরিসমাপ্তি হলেও বেলায়েতি মিশন তথা যুগ সংস্কারকের ধারা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সকল দরূদ ও সালাম বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি। যিনি আইয়্যামে জাহেলী যুগের সমস্ত অন্ধকার বিদূরিত করে আলোর পথে, সত্য ও কল্যাণের পথে, আল্লাহর পথে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূতরূপে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যার পদাঙ্ক অনুসরণে আবু বকর, ওমর, ওসমান ও হযরত আলী (রা.)-এর মত মহান সাহাবাগণ বিশ্ব ইতিহাসে উজ্জ্বল ভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁর সকল সাহাবা ও প্রেমিকগণ বিশ্ব মানবতার মুক্তি, কল্যাণ ও সত্যের পথে একনিষ্ঠ সেবকরূপে নজিরবিহীন দৃষ্টান্তের স্বাক্ষর রেখে গেছেন । ইতিহাসে তার বিরল স্বাক্ষর রয়েছে। বিশ্বনবীর অনুসারী তাবঈ, তাব্ তাবঈ, আইয়্যামে মুজতাহিদীন, মুহাদ্দিসীন, মুফাসিরীনসহ অসংখ্য মহামনীষীর আগমন ও কর্মধারায় বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ উত্তরোত্তর উন্নয়ন ও বিকাশের চরম শিখরে উপনীত হয়েছেন। যারা নিরলসভাবে মুসলিম জাতির খেদমতে নিজেদের সদা-সর্বদা নিয়োজিত রেখেছেন। তেমনি উপমহাদেশে মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত সুফিকবি ও দার্শনিক, আশেকে রাসুল ড. আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (র.) ছিলেন ঘুমন্ত ও পতিত মুসলিম জাতির জাগরণ ও বিকাশের অবিসংবাদিত অগ্রসৈনিক।
ড. আল্লামা ইকবাল (র.) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে গভর্নমেন্ট কলেজ লাহোর থেকে শিক্ষা ছুটি নিয়ে ইউরোপ চলে যান এবং ট্রিনিটি কলেজ ক্যামব্রীজে ভর্তি হন। তিন বছর নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানের মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের লিংকন ইনস্টিটিউট থেকে বার-এট-ল ডিগ্রি লাভ করেন । লন্ডনে থাকা অবস্থায় তিনি বিভিন্ন বিষয়ে লেকচার দিতেন। লন্ডনে শিক্ষা গ্রহণ শেষে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে ভারত প্রত্যাবর্তন করেন। আল্লামা ইকবাল
ইউরোপ অবস্থানকালে তাদের চিন্তাধারা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও দৈনন্দিন জীবনে উন্নতি এবং তাদের নিজ তাহযীব ও তামাদ্দুনের মূল্যায়নকে অতি নিকট থেকে দেখার সুযোগ লাভ করেন। তিনি ইউরোপবাসীর জ্ঞান চর্চা, বিজ্ঞানে অগ্রগতি, স্বাধীনতার চেতনা, কর্মপদ্ধতি ও দেশপ্রেম দ্বারা খুব প্রভাবিত হন। অবশেষে তিনি তাঁর জন্মস্থানে ফিরে আসেন। ফিরে এসে মুসলমানদের মধ্যে অসলতা, কর্মোহীনতা, দাসত্ব মনোভাব, অর্থনৈতিক মন্দা, জ্ঞান অন্বেষণের প্রতি অনীহা ইত্যাদি দেখে খুবই মর্মাহত হন। তিনি আরো দেখতে পান মুসলমানরা আমলীভাবে উদাসীন হওয়া সত্ত্বেও শুধু ইসলামের মৌলিক আকিদা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই নিজেদের ব্যাপারে আল্লাহর প্রিয় কওম ও মনোনীত জাতি হওয়ার ভুল ধারণার পড়ে আছে। মুসলমানরা একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ায় নিজেদেরকে তো নিজেরা ইসলামের প্রেমিক মনে করছে; কিন্তু বাস্তব জীবনে তারা বিশ্বনবীর অনুপম আদর্শ, প্রেম, কুরআনী শিক্ষা, উসওয়ায়ে রাসুল এবং শাশ্বত শান্তির ইসলাম থেকে বহু দূরে চলে গিয়েছে। অধিকন্তু তারা আল্লাহর উপর দীন-দুনিয়ার সকল প্রকার নাজ ও নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করে। এ কথাই ইকবালের কবিতা শিকওয়ার মূল উৎস। শুধু ভারতবর্ষ নয় বরং পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুসলমানরাও রাজনৈতিক পশ্চাদপদতা, অর্থনৈতিক দৈন্যতা এবং গোলামী মনোভাবের ছোবলে আটকে পড়েছিল। কেউ কেউ এর কবল থেকে বেরিয়ে এলেও বিশ্বনবীর অনুপম আদর্শ, প্রেম ও সার্বজনীন ও শান্তির ইসলাম থেকে দূরে থাকার দরুণ আজ মুসলিম জাতি নিম্নস্তরে নিমজ্জিত। ইরান, ইরাক, তুর্কী, মিশর এবং আফ্রিকাতেও তাদের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না ।
এমনিভাবে তারাবলুস এবং বলকান এর যুদ্ধের বিপর্যয় ও মুসলমানদের অধঃপতনের অনুভূতিকে আরো বেশি কঠিন বানিয়েছিল। বিশ্বের মুসলমান বিশেষভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানের শোচনীয় অবস্থা এবং গোলামী ও পরাধীনতা আল্লামা ইকবালকে প্রসিদ্ধ কবিতা 'শিকওয়া ও জওয়াবে শিক্ওয়া' লেখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। ড. আল্লামা ইকবাল (র.) মুসলমানদের করুণ অবস্থা দেখে বর্তমানে মুসলমানদের অধঃপতনের কারণসূহ এবং অতীতকে এই দুই কবিতায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন । শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া' পড়ে একদিকে আমাদের অতীত উন্নতির ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অপর দিকে আমাদের বর্তমান অধঃপতনের কারণও সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
আল্লামা ইকবালের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, আমরা আমাদের আলোকিত অতীতকে স্মরণ করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সু-সজ্জিত করতে পারি। আল্লামা
