'স্রষ্টার হাতে সত্য ছিল একটি আয়না'- যা পড়ে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। প্রত্যেকে এর একটি করে হাতে পায় এবং তার দিকে তাকায় আর ভাবে শুধুমাত্র তারাই পেয়েছে প্রকৃত সত্যকে। কিন্তু সত্য এই যে, আল্লাহ এক কিন্তু তাকে পাওয়ার পথ অনেক। এই উপলব্ধির আলোকে সুফিকুল শিরোমণি জালালুদ্দিন রুমি বলেন: কোনো নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে সংযুক্ত করো না যাতে অন্যগুলোকে তুমি অবিশ্বাস করো: তাহলে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ব্যর্থ হবে সত্য উপলব্ধি করতে। সর্বত্র বিরাজমান, সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কোনো একটি ধর্মে সীমাবদ্ধ নন, কারণ তিনি বলেছেন, তুমি যেদিকেই তাকাবে সেখানেই পাবে আমার মুখাবয়ব। সবাই যার যার স্তুতি গায়; তার ঈশ্বর তার নিজস্ব সৃষ্টি, প্রশংসা করতে গিয়ে সে আত্মপ্রশংসা করে। অন্যদের বিশ্বাসকে দোষারোপ করে, ন্যায় আচরণ হলে সে এমনটি করতে পারে না, কিন্তু অপছন্দের মূলে রয়েছে অজ্ঞতা (Rumi & Ibnul Arabi Rh.)। জালালুদ্দিন রুমি বলেন: 'স্রষ্টার কাছে পৌঁছানোর অজস্র পথ আছে। তার মাঝে আমি প্রেমকে বেছে নিলাম।' তাই বলা যায়, সুফিদর্শনের প্রধান পথ হলো প্রেম। সুফিরা প্রেমের মধ্য দিয়েই স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চান। মানবমনের গতানুগতিক শক্তিবলে নয়, এক ধরনের প্রগাঢ় অন্তর্দৃষ্টি বা অতীন্দ্রিয় অনুভব শক্তির সাহায্যেই কেবল পরাতাত্ত্বিক ও পারমার্থিক ঐশী জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। ইসলামের ইতিহাসে এভাবে যারা অতিপ্রাকৃত উপায়ে পরমসত্তা বা আল্লাহর সঙ্গে একাত্মতা অর্জনে নিবেদিত তাঁরা সুফি নামে পরিচিত।
সুফির লক্ষ্য হচ্ছে, নিজেকে ধীরে ধীরে শুদ্ধ করা বা পবিত্র করার একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা। এই প্রক্রিয়াটি সাধকের ভেতরে পরিবর্তন আনে এবং সাধককে একটি নিগূঢ় সত্যের দিকে নিয়ে যায়। অনেক পণ্ডিত, গবেষক, ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেন যে, হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর মধ্যে একদল সাহাবি ছিলেন, যারা ছিলেন অন্যান্য সাহাবি থেকে একেবারেই আলাদা। তাঁরা মুহম্মদ (সা.)-এর বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি ঘটনাবলিতে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করতেন না এবং এসব অনুষ্ঠানে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্তও হতেন না। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে যে, রাসুল (সা.) যখন রাতের তিন ভাগের দুই ভাগ, কখনো অর্ধেক, আবার কখনো তিনের এক ভাগ জেগে থাকেন, তখন তাঁর সঙ্গীদের একটি দলও জেগে থাকেন (সুরা মুজাম্মিল ৭৩:২০)। তাঁরা রাতে বা নির্জনে একান্তে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কথা বলেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কথা বলার সময় বা অন্যান্য সময়ও তাঁদের চোখেমুখে একটা ভাবের তন্ময়তা থাকতো। তাঁরা সংসার করেছেন কিন্তু সংসারে বেশিক্ষণ সময় দেননি। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তাঁরা বাইরে যেতেন না, কথাও খুব একটা বলতেন না। পৃথিবীর সুখসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি তাঁদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। বলা যায়, তাঁরা দিন এনে দিন খেতেন, না পারলে উপোস করতেন, সঞ্চয় করার কোনো প্রবণতাই ছিল না তাদের মাঝে, পার্থিব কোনো বস্তু সংরক্ষণেও আগ্রহী ছিলেন না তারা। তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল স্রষ্টা ও সৃষ্টির গভীর রহস্য, আত্মা, ভাগ্য, ইহকাল, পরকাল, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি। তাঁদের একটা উল্লেখ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁরা অধিকাংশ সময় ধ্যানমগ্ন থাকতেন, একটা তন্ময় অবস্থা লালন করতেন। তাঁদের একজন হজরত আবু হোয়ায়রা (রা.) বলেছেন, 'আমি রাসুল পাক (সা.)-এর কাছ থেকে দুই রকম জ্ঞান অর্জন করেছি। এক রকম জ্ঞান আমি সকলের কাছে প্রকাশ করেছি, আরেক রকম জ্ঞান আমি প্রকাশ করেনি। যদি প্রকাশ করতাম, তবে শরিয়ত অনুযায়ী আমার খাদ্যনালি কর্তন
করা হতো।' (সহি বোখারি শরিফ: ৯৫)। প্রশ্ন হতে পারে কেন খাদ্যনালি কর্তন অর্থাৎ শিরশ্ছেদ করা হতো? প্রথমত সাধারণ বা শরিয়তের জ্ঞান দিয়ে সেই জ্ঞানটি বোঝা যাবে না। ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা তৈরি হতো। দ্বিতীয়ত এই জ্ঞানটি উচ্চভাব ও চিন্তার, গভীর তত্ত্বজ্ঞান ও মননের। এ রকম একটি মানসিক উন্নতির স্তরে কেউ উপনীত না হলে তা ধারণও করতে পারবে না। এ কারণেও তা গোপন করা হয়েছে। বস্তুত গোপনে চর্চা হয় বলে তাকে বলা হয় গুপ্তজ্ঞান। একজন কামেল বা আদর্শ মানব তাঁর অতীন্দ্রিয়, চিরন্তন ও অমর সত্তাকে বুঝতে সক্ষম হন। যেহেতু তিনি আত্মিক উন্নতির দ্বারা ঐশীসত্তার গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজে অমরত্ব লাভ করেন। প্রত্যেক মানুষই ব্যক্তিজীবনে এই উন্নতির পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম। আদর্শ মানব সাধন-জীবনের চরম লক্ষ্য ও উন্নতির সর্বশেষ স্তর। ঐশী গুণে গুণান্বিত হবার পরই একজন মানুষ পূর্ণ মানবত্ব অর্জন করতে সক্ষম হন। আদর্শ মানব স্রষ্টার অতি নিকটবর্তী ব্যক্তি। আদর্শ মানব ও স্রষ্টার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের তৃতীয় কোনো মাধ্যম নেই।
