ভূমিকা
সুফিতত্ত্বে আবু উমর আল হুসাইন বিন মনসুর আল হাল্লাজ এক অবিস্মরণীয় নাম। মরমী প্রেমের জীবন্ত কিংবদন্তি—শহীদ৷ে পরম সত্তার প্রমাণিক সাক্ষ্যরূপে যিনি সমুজ্জ্বল। তাঁর দেহের প্রতিটি অনু-পরমানুই যে সাক্ষ্যের জ্বলন্ত প্রমাণ। তাই দেহের আকারটি মাপা যায়। আত্মার আকারটি মাপা যায় না। কারণ আত্মার আকার নেই। তাই আত্মা চোখে দেখা যায় না। তবে কি আত্মা নিরাকার? এই নিরাকার আত্মার রহস্য বুঝতে সর্ব যুগে সর্ব ধর্মে এক শ্রেণির বিশেষ মানুষ গবেষণা করেছেন। কারণ বিষয়টি অনেককেই ভাবিয়ে তোলে। যখন আত্মার রহস্যটি বিশেষ কিছু মানুষের কাছে ধরা পড়ে তখন তাদের সবার মুখে একই এবং একটি কথাই উচ্চারিত হয়। যে কথাটি আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে বিশেষ মানুষটি বলেছিলেন, “সোহহং সোহমী” অর্থাৎ “আমিই তিনি”। আবার কয়েক শত বছর আগে মনসুর হাল্লাজ (রা.)ও বলেছিলেন, “আনা আল-হক্ক” অর্থাৎ “আমিই একমাত্র সত্য"।
এই অপরাধ ছাড়াও আরো নানা কারণে হাল্লাজকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১২২ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চ। ইব্রাহিম ইবনে ফাতিক বর্ণনা করছেন : হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজকে যখন মৃত্যুদণ্ড দিতে নিয়ে আসা হলো। তিনি ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে তাকিয়ে এমন উজ্জ্বল হাসিতে ভেঙে পড়লেন যে তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু বেরিয়ে এল। তিনি সমাগত জনতার দিকে তাকিয়ে শিবলিকে দেখতে পেয়ে বললেন, 'হে আবুবকর, তোমার কাছে জায়নামাজ আছে?” শিবলি বললেন, 'ও শেখ, আছে!' হাল্লাজ জায়নামাজ বিছাতে বললেন। তিনি তাতে দুই রাকাত নামায পড়লেন। শিষ্য শিবলি তাঁর কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। প্রথম রাকাতে তিনি সুরা ফাতিহার সঙ্গে এই আয়াত পাঠ করলেন।
'প্রত্যেক প্রাণীকে আশ্বাসন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কেয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, আর কার্য সিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিক জীবন ধোঁকা ছাড়া কিছু নয়।
- সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১৮৪
'দ্বিতীয় রাকাতে তিনি ফাতেহার সঙ্গে এই আয়াত পাঠ করলেন :
*এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সন্নিধ্যে ফিরে যাব তাদের প্রতিই তাদের প্রভুর অনুগ্রহ ও কৃপা রয়েছে। আর তারাই রয়েছে সঠিক পথে।
-সুরা: আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫-১৫৭
শিবলি বললেন : নামাজ শেষ করে তিনি যে প্রার্থনা করলেন আমি কেবল তার এটুকুই মনে রাখতে পেরেছি :
'...হে প্রভু, তুমি আমাকে যে কৃপা করেছ তার জন্য আমার কৃতজ্ঞ হওয়ার সুযোগ দাও। অন্যদের চোখ হতে লুকিয়ে রেখে তুমি তোমার দীপ্তিময় মুখশ্রীর যে রূপ আমার সামনে অনাবৃত করেছ, যে রূপের কোনো আকার নেই। তোমার গোপনতম রহস্য আমার জন্য বৈধ করেছ। সেই রহস্য অন্যদের কাছে অবৈধ রেখেছ। তোমার যে দাসেরা তোমার ধর্মের খাতিরে, তোমার অনুগ্রহ পেতে আমাকে হত্যা করতে একত্রিত হয়েছে, তাদের ক্ষমা কর, দয়া কর। আমাকে যা দেখিয়েছ তা যদি তাদের দেখাতে তবে নিশ্চয়ই তারা যা করছে তা করত না। আর তাদের কাছ হতে যা গোপন রেখেছ তা যদি আমার কাছ হতে গোপন রাখতে তবে আমি এই যন্ত্রণা ভোগ করতাম না। যাই করো তুমি, তোমারই হোক জয়, যা ইচ্ছে তোমার, তোমার ইচ্ছার হোক জয়।'
তারপর তিনি কিছুক্ষণের জন্য নীরব থেকে তাঁর প্রভুর ভাবনায় বিভোর রইলেন। তখন জল্লাদ আবুল হারিস এগিয়ে এসে তাঁর মুখে ঘুষি মারল। তাঁর নাক ভেঙে রক্তপাত শুরু হলো। শিবলি, আবুল হুসেইন আল ওয়াসিতি, এবং উপস্থিত সুপরিচিত সুফিয়া চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শহরে দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল : (Raynold A. Nicholson এর The Idea of Personality in Sufism হতে)।
এরপর হাল্লাজকে পাঁচশো চাবুক মারা হয়। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ক্রুশ আকৃতির কাঠামোতে বেঁধে। তৎকালীন বাগদাদে এর প্রচলন ছিল। একে বলা হতো তসলিব। সলিব মানে ক্রুশ, তসলিব মানে ক্রুশে চড়ানো। এই সলিব তৈরি হতো খেজুর গাছের কাণ্ড দিয়ে। শাস্তিপ্রাপ্তকে তাতে কখনো পেরেক ঠুকে কখনো দড়ি দিয়ে বাঁধা হতো। নিচে বিছানো হতো মোটা কাপড়, রক্ত যাতে ছড়িয়ে না পড়ে। পরবর্তীতে তসলিব বলতে কেবল ফাঁসিতে ঝোলানো বোঝানো হতো। তাই তুর্কি বা পারস্য মিনিয়েচারে হাল্লাজকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিতে দেখানো হয়েছে। হাল্লাজকে এমন ক্রুশে ঝুলিয়ে প্রথম দুই হাত, পরে দুই পা তরবারির আঘাতে ছিন্ন করা হয়। মাথা
