আল্লাহর আঠার হাজার মাখলুকাতের মধ্যে যে বিষয়টি চিনা-জানার, যাকে নিয়ে ভাবনার, যে বিষয়টি সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে একমাত্র অলৌকিক এবং সন্ধান করার বিষয় তা হলো মানুষ। আল্লাহ কে? তা ভাবনার বিষয় নয়, ভাবনার একমাত্র বিষয়টি হলো মানুষ। মানুষ সমস্ত সৃষ্টির মূলাধার, রমুজে এলাহী, মাখজানে আছরারে এলাহী, ছিন্নরে রবুবিয়াত তথা অহেদ দর কাছারাত এবং সমস্ত সৃষ্টি মানুষেরই বৈচিত্র্যতার প্রকাশ ও বিকাশ। কাজেই যারা মানুষতত্ত্ব নিয়ে ভাবেন, গবেষণা করেন এবং মানুষের মধ্যে আল্লাহকে খোঁজে বা সন্ধান করেন তারা জ্ঞানী। কারণ, যারা মানুষের মাধ্যমে, মানুষের মধ্যে আল্লাহকে পেয়েছে এবং আল্লাহর পাক জাতের মধ্যে বাস করে তারাই হলো আল্লাহর অলি বা বন্ধু তথা একই ফেৎরাতধারী। আল্লাহর অলিগণই জ্ঞানী। মানুষ আল্লাহতে ফানা হয়ে হয় ফানাফিল্লাহ তথা আল্লাহময়, শেষে নিজময় হয়ে যায় মানে বাকাবিল্লাহ প্রাপ্ত হয় তথা মানুষ নিজেকে নিজে খুঁজে পায়। নিজময় হয়ে যাবার কথাটি হযরত মনছুরের মুখে প্রকাশ পেয়েছিল কিন্তু অন্ধ, বধির ভেরেষ মোল্লাজাতি তার মর্ম বুঝে নি বিধায় তাঁর স্কুল অজুদটি পুড়ে ফেলে আসিম জাতির বিকৃত উল্লাসে মেতেছিল। যেহেতু আল্লাহর ধর্মের রহস্য এরা মোটেও বুঝে নি তাই বেশ-ভূষণের কৃত্রিমতা (Artificial) দিয়ে তারা মেকি ধার্মিক সেজেছে। এরা মুনাফেক-দজ্জাল-প্রতারক (Cheat)। যে আল্লাহর অলিকে চিনেনি, মানেনি সে আল্লাহর রহমত হতে অবশ্যই বঞ্চিত এবং মানুষ হওয়ার সমস্ত পথই তার রুদ্ধ হয়ে আছে। কারণ, মানুষকে চিনার জন্যই মানুষ হতে হয়। কাজেই যারা মানুষ চিনে নি তারা মানুষ নয়, আঠার হাজার মাখলুকাতযুক্ত জীব তথা আল্লাহর ফেরাত (Nature of Allah) হারানো মানুষ নামক জীব। জানা দরকার আল্লাহর অলিদেরকে আল্লাহপাক তাঁর জুব্বার তথা রহস্যের আড়ালে নিয়ে যান। আল্লাহ যাকে হেদায়েত দান করেন তিনিই পারেন আল্লাহর অলিকে চিনতে। মানুষ যেহেতু ফেৎরাত হারানো জীব, কাজেই এ জীব জগত হতে বের হয়ে আসলেই মানুষ নাম হয়। আল্লাহর ফেল্লাত বা প্রকৃতি ধর্ম দিয়েই হলো মানুষ (কোরান)। আলমে নাছুতে এসে মানুষ সে ফেরাত হতে বিস্মৃত হয়ে আছফালুস্ সাফেলিন হয় বিধায় আল্লাহর ফেল্লাত ধারণ করার জন্য রাছুল (সাঃ) বার বার মানবজাতিকে তাগিদ দিচ্ছেন। এজন্যই নবী রাছুল, অলি-আউলিয়াদের মহব্বত, সোহব্বত, খেদমত, দর্শন, ধ্যান-ধারণা, তাদের নিয়ে আলোচনা সর্বোত্তম ইবাদত এবং আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির একমাত্র কারণ। কোরানের মূল কথা এটি-ই এবং মানুষ হলেই এ কথার ভেদ-রহস্য জানা যায়। এ রহমত কাল্পনিক নয়, বর্তমান-বাস্তব। বাস্তব আল্লাহর রহমতকে যারা চিনে নি, বুঝে নি, মানে নি, মানতে চায় না, মানতে দেয় না, শুধু অনুমানে বিশ্বাসী (Faith of supposition)- এরাই হলো ইবলিশ, মরদুদ বা শয়তান। যেহেতু মানুষ হলেই মানুষ চিনা যায়, সেহেতু আল্লাহর অলিগণ পতিত মানব জাতির (আঠার হাজার মাখলুকাতভূক্ত জীব মানুষের) নিকট অপরিচিতই থেকে যাচ্ছে, কেবল আল্লাহ যাকে পথ দেখান সে-ই চিনতে পারে একজন মানুষকে (সুরা কাহাফ, ১৭ আয়াত)। মানুষের এক অর্থ মোহাম্মদ। মোহাম্মদ আহামদ হতে, আহামদ আহাদ হতে আর আহাদ-ই আল্লাহ (সুরা এখলাছ)। কাজেই আল্লাহর ফেত্রাতধারী মোহাম্মদ-ই হলো 'হুচ্ছামাদ'। ওয়াহেদ, আহাদ, আহামদ এবং মোহাম্মদ- এ চারটি অবস্থা মূলত: মানুষের সাধনার চারটি স্তরের বর্ণনা যা সুরা এখলাছে বিধৃত হয়েছে। কিচ্ছা কোরান (যা আরবী ভাষায় লিপিবদ্ধ) পাঠ করা আর চিরন্তণ, কদিম (Original) কোরানকে জানা, চিনা আল্লাহর কালাম স্বীয় কর্ণে শোনা এক কথা নয়। যারা আল্লাহর কালাম শুনে না, আল্লাহর কালামের প্রতি ঈমান রাখে না তারা বধির, অন্ধ এবং তারা পথভ্রষ্ট। আমাদের রাছুল (সাঃ) মানুষতত্ত্বের গোপন রহস্যটি তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দিচ্ছেন বিধায় তারা মানুষ চিনে মানুষ হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষের অবস্থান যে আঠার হাজার মাখলুকাতের বাহিরে তা বোধগম্য হচ্ছে, চিনতে পারছে এবং দেখতে পাচ্ছে। একমাত্র মানুষই আল্লাহর দর্শন লাভ করে এবং আল্লাহর পাক জাতে বাস করে তথা রবুবিয়াতে স্থিত হয়।
