আমাদের কথা
প্রাচীনকালে বাঙ্গালী সমাজে পুঁথি সাহিতের অত্যধিক কদর ছিল। আধুনিক গদ্য সাহিত্য সেকালে প্রতিষ্ঠিত হইলেও সমৃদ্ধ হইয়া উঠে নাই; সুতরাং লোকগণ পুঁথির দ্বারাই সাহিত্যের রস আস্বাদন করিত। যদিও সে পুঁথিপুস্তকগুলির ভাষা, শব্দ ও বাক্যঘটিত ভুল-ত্রুটির অভাব ছিল না।
তবে এ জাতীয় ভুল-ত্রুটির কথা বাদ দিয়া আম্বিয়াদের জীবন কাহিনীর দুষ্প্রাপ্য ঘটনাবলীর প্রাচুর্যের বিচারে উল্লিখিত বিরাট পুঁথিখানা নবী কাহিনীমূলক গ্রন্থের মধ্যে নিঃসন্দেহে শীর্ষস্থানীয় । কিন্তু সে যাহাই হউক না কেন, রুচিবোধের পরিবর্তন এবং ব্যবসায়িক প্রতিকূলতা তথা কাগজের মূল্য এবং মুদ্রণজনিত খরচাধিক্যের কারণে উল্লিখিত পুঁথিখানা দীর্ঘদিন পূর্বেই বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে, উহা আর প্রকাশ হইতেছে না। আর কোনদিন উহা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইবে বলিয়াও আশা করা যায় না; অথচ ঐ পুঁথিবর্ণিত বিবরণগুলি জানিবার জন্য আগ্রহী লোকের অভাব নাই ।
আমরা সেদিকে লক্ষ্য করিয়াই আপ্রাণ চেষ্টায় দীর্ঘকাল পূর্বের মুদ্রিত একখানা পুঁথি সংগ্রহ
করিয়া তৎকালীন পয়ার ছন্দে লিখিত উহার বিবরণাবলীকে প্রচলিত আধুনিক গদ্য ভাষার মাধ্যমে ফুটাইয়া তুলিতে প্রয়াস পাইয়াছি।
মহান স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহ পাকের মাহাত্ম্য, মহত্ত, গুণ, ক্ষমতা ও কুদরতের বর্ণনা করা কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা তাহা যে কোন ব্যক্তির শক্তি, সাধ্য ও জ্ঞানের বাহিরে । তবে মোটামুটিভাবে তাঁহার সম্পর্কে দুই একটি কথা যাহা বর্ণনা করিতেছি তাহা তাঁহার অসীম ও অফুরন্ত গুণ ও ক্ষমতার লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগও নয় ।
তিনি লাশরীক আল্লাহ- তাঁহার সমকক্ষ আর কেহ নাই। তিনি নিরাকার- কেহই তাঁহাকে দেখিতে পায় না। তিনি ধারণা ও কল্পনার বাহিরে । তাঁহার রূপ ও গুণের কথা ভাবিয়া কূল পাওয়া যায় না। তিনি সকলের চোখের আড়ালে থাকিয়া স্বীয় কুদরতী কারিগরী চালাইয়া যাইতেছেন। আর তাঁহারই মাধ্যমে সুষ্ঠু সঠিকভাবে সারা জাহানের সবকিছু পরিচালিত হইতেছে। এই বিশ্ব-দুনিয়া, আকাশ-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ- নক্ষত্র, পাহাড়-প্রান্তর, সাগর-ভূদর তাঁহারই সৃষ্টি। জ্বিন, মানব, ফেরেশতা, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ প্রভৃতি তিনিই পয়দা করিয়াছেন। সপ্তস্তর আকাশ তিনি কিভাবে তৈরী করতঃ শূন্যে লটকাইয়া রাখিয়াছেন, উহার একটি আর একটির সাথে সংবদ্ধ বা সম্পৃক্ত নয় অথচ যে যাহার স্থানে সম্পূর্ণরূপে সুদৃঢ় অবস্থায় দাঁড়াইয়া আছে। সপ্ততল ভূতলেরও একই অবস্থা । ইহা পরম বিস্ময়কর ও একান্ত অভাবনীয় ঘটনা ছাড়া আর কি?
তাঁহার সীমাহীন কুদরতের লীলা সারা জগত ব্যাপিয়া চোখের সম্মুখে ভাসে ও অন্তরে অনুভব করা যায়। মাটিতে একটি ক্ষুদ্র বীজ পতিত হইয়া তাহাতে অঙ্কুর গজাইয়া ধীরে ধীরে তাহা বিরাট মহিরূহে পরিণত হয়। একমুষ্টি মাটি হইতে আদম (আঃ)-এর মূর্তি বানাইয়া তাহাতে কি এক আজব রূহ ঝুঁকিয়া দিবার ফলে সে মূর্তি জীবন্ত হইয়া যায়। তাহা নড়াচড়া করে, কথা বলে, কথা শুনে, -কাঁদে, সুখ-দুঃখ অনুভব করে, ভাল-মন্দ বুঝে। আল্লাহর কুদরত ছাড়া কাহার এমন সাধ্য যে এরূপ করিতে পারে।
জগতে
তাহার একদিকে যেমন কুদরতের পারাপার নাই, অন্যদিকে অভিরুচি ও ইচ্ছারও অন্ত নাই । সৃষ্ট মানুষকে সবার শ্রেষ্ঠ সম্মানিতরূপে বানাইয়া, তাহাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি প্রদান করতঃ কে সহাদের মধ্যে তাঁহার অনুগত ও কে অবাধ্যগত তাহা যাচাই করিয়া দেখার জন্য ভাল-মন্দ দুইটি পথ তাহাদের সামনে রাখিয়া দিয়াছেন। যে এরূপ পথের অনুসরণ করে, সে তদ্রূপ তার ফল লাভ করিবে। দল পথ চিনাইবার জন্য তিনি একদিকে যেমন অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন, অন্যদিকে মন্দ গে টানিয়া নেওয়ার জন্য ঠিক তেমনি আবার শয়তান-ইবলীসও রহিয়াছে। এই অবস্থার উপর ভিত্তি এরিয়াই দুনিয়াতে ভাল ও মন্দ, পাপ ও পুণ্য, সৎ ও অসতের খেলা চলিতেছে। অবশ্য ইহারও পরিণতি। আছে। অনন্ত কাল ইহা স্থায়ী থাকিবে না। একদিন এই খেলা সাঙ্গ হইয়া যাইবে, সেদিন ভাল-মন্দের পিতার হইবে। বিচারে ভালর জন্য ভাল ফল এবং মন্দের জন্য মন্দ ফল লভিবে ।