শরিয়তি সেজদা মারেফতি সেজদা
মহাপ্রভু মহানবি (আ.)-এর একটি খণ্ডিত বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করা যাক। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের মাঝে খুব বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়। অবশ্য গবেষণার আলোকে যদি চুলচেরা বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও ধারালো যুক্তির মানদণ্ডে দাঁড় করানো যায় তাহলে অনেকের কাছেই এ অখণ্ড বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠবে এবং তকদিরের লিখন অনেকের হয়তো বদলিয়ে যেতে পারে। বিষয়টি সামান্য মনে হলেও মোটেই সামান্য নয়। আমরা ভাল করেই জানি যে, একমাত্র মানুষ এবং জিন জাতি (অবশ্য আমাদের জানা মতে) ছাড়া সৃষ্টিরাজ্যের কেহই শেরেক করতে পারে না। অর্থাৎ শেরেক করার কোন ক্ষমতাই দেওয়া হয়নি। তাই আসমান এবং জমিনের যা কিছু আছে সবাই তৌহিদে বাস করে এবং তৌহিদ সাগরে ডুবে আছে। সুতরাং যেখানে আসমান জমিনের সবকিছু তৌহিদে বাস করছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে শেরেক করার প্রশ্নই উঠে না। কারণ শেরেক করার অধিকারই দেওয়া হয়নি। যেখানে অধিকারই নেই সেখানে অধিকারের প্রশ্ন তোলাই অবান্তর। মহাপ্রভু মহানবির কতটুকু চরম মর্যাদা তারই আলোচনা করছি। মারেফতের গোপন কথায় তিনি কে এবং তাঁর আসল রহস্য কী, অনেকে পরিষ্কার বুঝতে পেরেও সাধারণ মানুষ যেন সাধারণ বুদ্ধিতে ভুল না করে তার জন্য শরিয়তের বিধান দেবার ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষ প্রাচীন কাল হতে আজ এই আধুনিক যুগেও প্রায় একই রকম চরিত্র বহন করছে। সমাজের পরিবর্তন, যুগের বিবর্তন এবং বিজ্ঞানের বিকাশের দরুন হয়তো সেকালের সাধারণ মানুষ আজকের দিনে কিছুটা উন্নত হতে পারে, কিন্তু মূলত সাধারণেরা চিরদিনই সাধারণ।
তবুক নামক যুদ্ধের ব্যয়ভারের অধিকাংশ দান করেছিলেন মহানবির জামাতা হযরত উসমান গণি (রাঃ)। এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বেশ কিছু সংখ্যক উট এবং গরুও দান করা হয়। যখন হযরত উসমান (রা.) উট এবং গরুগুলো মহানবিকে দান করছেন তখন এক অবাক কাণ্ড ঘটে গেল। যে সকল মহান সাহাবারা তখন সেখানে হাজির ছিলেন তারা সবাই অবাক
না। তাই শেরেক করা নিতান্ত স্বাভাবিক। ইচ্ছাশক্তি, স্বাধিকার, আমিত্ব, 'আমি আমি', 'আমার আমার' এই ভাবগুলো কেবল মানুষ এবং জিনকেই কিছুদিনের জন্য দেওয়া হয়েছে এবং এইরূপ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আল্লাহ সহজে হস্তক্ষেপ করেন না। এখন প্রশ্ন হল, যারা সব সময় তৌহিদে বাস করছে তারা কোনমতেই শেরেক করতে পারে না। যেহেতু পশু প্রাণীরা তৌহিদে বাস করছে সেইহেতু তাদের পক্ষে শেরেক করার কথাটি অসম্ভব এবং অবান্তর। আল্লাহকে ছাড়া অন্যকে যদি সেজদা দেওয়া শেরেক বলে ধরে নেই তা হলে মহানবিকে পশু প্রাণীরা কেন সেজদা করলো? পশুরা কি জানতো যে, মহানবিই আল্লাহ্ পাকের গুণে গুণান্বিত? পশুরা কি জানতো যে, আল্লাহ্ এবং মহানবিকে যারা ভাগ করে দেখে তারা খাঁটি কাফের? তারা কি কোরানের সুরা নিসার রহস্য আপনা হতেই জানতো? তাই হয়তো অনেক সুফি সাধক দুঃখ করে বলে গেছেন যে, বনের পশুরা মহানবিকে চিনতে পারলো আর আমরা মানুষ হয়েও চিনতে পারলাম না। পশুরা কি জানতো না যে, আল্লাহ ছাড়া মহানবিকে সেজদা দেওয়া শেরেক? আল্লাহকে ফেলে মহানবিকে কী করে পশুরা সেজদা দেয়, যদি পশুরা তৌহিদে বাস করে? তাহলে তৌহিদের রহস্য এত হাল্কা-পাতলা নয় যে সহজেই বোঝা যায়। মহানবি যদি আল্লাহ হতে আলাদা হতেন তা হলে পশুরা কিছুতেই সেজদা দিতে পারে না। কারণ তৌহিদে শেরেক নেই। তাছাড়া আরো একটি প্রশ্ন উঠে যে, মহানবি যদি সত্যিই আল্লাহ হতে আলাদা হতেন তাহলে পশুদের সেজদা দিতে মানা করে দিতেন। পশুরা যখন মহানবির পায়ে সেজদা দিতেছিল তখন মহানবি কেন পা সরিয়ে নেননি? কেন মহানবি পশুদেরকে বলে দিলেন না যে, আল্লাহকে সেজদা কর, আমাকে নয়? এরকম উপদেশতো তিনি পশুদেরকে দেননি বরং সেজদা গ্রহণ করেছেন। মহানবি যত বড় নবিই হোন না কেন, তিনি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নবিই হোন না কেন, কিন্তু তিনি যদি আল্লাহ হতে আলাদা হতেন তাহলে পশুরা শেরেক করেছে বলে অবশ্যই ধরে নিতে হয়। কিন্তু আসল সত্য কথাটি হল, তিনি আল্লাহ হতে মোটেই আলাদা নন। আল্লাহর গুণাবলী হতে তিনি মোটেই পৃথক নন। আর এই গোপন রহস্যটি পশুরা ভাল করে জানে বলেই মহানবিকে সেজদা করেছে এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। তিনি চিৎকার করে পশুদেরকে শেরেক করার কথা ঘোষণা করেননি। তৌহিদের দেশে যারা বাস করে তারা পশু হোক আর যাই হোক না কেন সবাই এককের মাঝে এক অদ্বৈত সত্তা। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পশুরা কেন