ইসলাম এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার মনোনীত একমাত্র দীন বা জীবনব্যবস্থা। ইসলামী শরীআত তথা জীবনবিধানের মূল উৎস আল্লাহ্ তাআলার কালাম কুরআন মাজীদের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র হাদীস ও সুন্নাহর স্থান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত বাণী, তাঁর কর্ম এবং মৌন সমর্থন ও অনুমোদন হচ্ছে হাদীস বা সুন্নাহ। পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা এবং ইসলামী শরীআতের বিভিন্ন হুকুম-আহকাম ও দিক-নির্দেশনার জন্য হাদীসের বিকল্প নেই। প্রকৃতপক্ষে হাদীস বাদ দিয়ে কুরআন মাজীদের মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। কারণ পবিত্র কুরআন মাজীদ হলো সংক্ষিপ্ত, ইংগিতধর্মী ও ব্যঞ্জনাময় আসমানী গ্রন্থ। হাদীস হলো পবিত্র কুরআন মাজীদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। এ জন্য হাদীস হচ্ছে ইসলামী শরীআর দ্বিতীয় উৎস।
'সুনানে আবূ দাউদ' সিহাহ সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত একটি সুপ্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থ। হিজরী তৃতীয শতাব্দীর প্রথমার্ধে এ হাদীসগ্রন্থটি সংকলন করেন ইমাম আবু দাউদ সুলায়মান ইবনুল আশআস আস-সিজিস্তানী (রহ)। তিনি হিজরী ২০২ সনে সিজিস্তান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ইন্তিকাল করেন হিজরী ২৭৫ সনের শাওয়াল মাসে। তিনি অল্প বয়সেই হাদীস ও ফিকাহশাস্ত্রে জ্ঞান অর্জনের জন্য বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেন ও তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে অধ্যয়ন করেন। তাঁর শিক্ষকগণের তালিকায় রয়েছেন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ), উসমান ইবনে আবু শায়বা (রহ), কুতায়বা ইবনে সাঈদ প্রমুখ। তাঁর অন্যতম শিষ্য হচ্ছেন সিহাহ সিত্তাহভুক্ত অন্যতম হাদীসগ্রন্থ তিরমিযীর সংকলক ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ)।
ইমাম আবু দাউদ (রহ) প্রায় পাঁচ লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেন। এ পাঁচ লক্ষ হাদীস থেকে বাছাই করে মাত্র ৫১৮৬টি হাদীস তিনি তাঁর সুনানে অন্তর্ভুক্ত করেন। এ গ্রন্থে কেবল ঐ সকল হাদীস স্থান পেয়েছে যা সহীহ বলে সংকলকের বিশ্বাস হয়েছে। তাঁকে হাদীস শরীফের হাফিয ও সুলতানুল মুহাদ্দিস বলা হয়ে থাকে।
সুনানু আবূ দাউদ-এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইমাম মুসলিম (রহ) তাঁর সহীহ্ 'মুসলিম'-এর ভূমিকায় বলেন, আবূ দাউদ হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি হাদীসের বিস্তারিত টাকা লিখেন। ইমাম আবু দাউদ এমন অনেক রাবীর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেন যাঁদের উল্লেখ বুখারী ও মুসলিমে নেই। কেননা তাঁর নীতি হলো সেই সকল রাবীকে বিশ্বস্ত বলে গণ্য করা যাঁদের সম্পর্কে
অবিশ্বস্ততার কোন যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায় না।
বিশ্বস্ততা ও টীকা-ভাষ্যের কারণে হাদীস বিশারদগণ এ সংকলনটির উচ্ছসিত প্রশংসা করেন। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ ইবনে মাখলাদ (রহ) বলেন, "হাদীস বিশারদগণ বিনা দ্বিধায় এ গ্রন্থটি গ্রহণ করেন যেমন তাঁরা কুরআনকে গ্রহণ করেন। আবু সাইদ আল-আরাবী (রহ) বলেন, "যে ব্যক্তি কুরআন ও এ গ্রন্থ ছাড়া আর কিছু জানেন না, তিনিও একজন বড় আলিম বলে গণ্য হতে পারেন।"হাবযাতে শতাধিক ভাষায় এ মশহুর হাদীসগ্রন্থটি অনূদিত হয়েছে। মাতৃভাষার দিক থেকে বিশ্ব মুসলিমের মধ্যে বাংলাভাষী মুসলিমের সংখ্যা শীর্ষস্থানে। এ বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী পৌঁছে দেয়ার নিমিত্তে সিহাহ্ সিত্তাসহ বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থের বাংলা অনুবাদ প্রকাশের এক বৃহৎ কর্মসূচী আমরা গ্রহণ করেছি। এ কর্মসূচীর আওতায় ইতোমধ্যে বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, সুনানে নাসাঈ শরীফ, মিশকাত শরীফ ও রিয়াদুস সালিহীন প্রভৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এক্ষণে সুনানে আবূ দাউদ শরীফের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। এ গ্রন্থটি প্রকাশ করতে পেরে আমরা মহান আল্লাহ তা'আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি। যাদের সহায়তায় এ কাজে সফলকাম হতে পেরেছি তাদের সকলের প্রতি রইল অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা।
সাবধানতা : সাহাবায়ে কিরাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার বাণী, "মহান আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর (স্রষ্টার) উপর সন্তুষ্ট" -এ ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সাহাবায়ে কিরাম সবাই ন্যায়পরায়ণ; তুমি যাকে অনুসরণ করবে নাজাত পাবে”। মহান ও পুণ্যবান সাহাবীদের কোন বক্তব্যকে অবমূল্যায়ন বা মিথ্যা ভাবলে গুনাহগার হবে। কাজেই সাহাবীদের হাদীসের সমালোচনা করা নিষিদ্ধ। সুতরাং হাদীস শরীফ পাঠকালে কোন প্রকার গরমিল বা অসামঞ্জস্য দেখা দিলে ব্যাখ্যা গ্রন্থের সাহায্য নেয়া উচিত। এতদ্ব্যতীত ফিকাহের কিতাবাদিও প্রচুর পাঠ করলে হাদীসের মর্ম অনুধাবন করা সহজতর হবে। হাদীসে কোন মাযহাবের বিপরীত কোন বর্ণনা আসলে সে মাযহাবের গ্রন্থাদি পড়ে বা ফেকাহের কিতাবাদি দৃষ্টে অথবা হক্কানী আলেমের শরণাপন্ন হয়ে সমাধানে পৌঁছতে হবে।
এ গ্রন্থখানা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাংলা সহজ-সাবলীল চলতি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে সুনানে আবূ দাউদ শরীফ-এর উপমহাদেশীয় সংস্করণের অনুসরণ করা হয়েছে। সনদের ক্ষেত্রে প্রথম রাবী এবং শেষ রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন কুতায়বা ইবনে সাঈদ (রহ)... আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। সনদের যেখানে তাহবীল রয়েছে সেখানে প্রথম রাবীর সঙ্গেই তাহবীলকৃত রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। 'কিতাব'- কে 'অধ্যায়' এবং 'বাব'-কে 'পরিচ্ছেদ' হিসেবে সাজানো হয়েছে। আরবী, ফার্সি ও উর্দু বানানের ক্ষেত্রে আমাদের নিয়ম-নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতদসত্ত্বেও যদি কোন ভুল-ত্রুটি পাঠক বন্ধুদের গোচরীভূত হয়, তবে গঠনমূলক উপদেশ পাঠালে পরবর্তী সংস্করণে তা শোধরাতে বাধ্য থাকব -ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে হাদীসের জ্ঞানে উদ্ভাসিত করুন এবং সুন্নাতের অনুসারী হবার তাওফীক দিন। আমীন!
